সিডনির দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ উদ্বোধনের পর বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এর ডিজাইন নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকেই বলছেন, এই ডিজাইন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কোন আদল বহন করেনা। এই স্তম্ভ নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করবে। এ প্রসঙ্গে কিছু কথা:
কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার:
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বহিপ্রাঙ্গনে অবস্থিত ‘কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার’ ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ। প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছিল ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সেদিন বিকেলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শুরু করে অতিদ্রুত এবং নিতান্ত অপরিকল্পিতভাবে রাত্রির মধ্যে তা’ সম্পন্ন করে।
পরবর্তীতে, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেবার পরে ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এর নকশা করেছিলেন ভাস্কর হামিদুর রহমান। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহীদ ব্যক্তিত্ব আবুল বরকতের মাতা হাসিনা বেগম কর্তৃক নতুন শহীদ মিনারের উদ্বোধন করা হয়
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হামিদুর রহমান মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মিনারের স্থপতি। তাঁরই রূপকল্পনায় ছিল স্নেহময়ী আনত মস্তক মাতার প্রতীক হিসেবে মধ্যস্থলে সুউচ্চ কাঠামো, এবং দুই পাশে সন্তানের প্রতীক স্বরূপ হ্রস্বতর দুটি করে কাঠামো। সামনে বাঁধানো চত্বর। পেছনভাবে দেয়ালচিত্র।
বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ:
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। সেই হিসেবে সারা বিশ্বের ১৮৫ দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে থাকে।
তারই ধারাবাহিকতায় এসফিল্ড কাউন্সিল, বাংলাদেশ সরকার, একুশে একাডেমি অস্ট্রেলিয়া, এবং স্থানীয় মাতৃভাষাপ্রেমী সকলের সার্বিক ও সামগ্রিক সহযোগিতায় ২০০৬ সালের ১৯ই ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর সকল মাতৃভাষা সংরক্ষণের বার্তা নিয়ে বাংলাদেশের ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’ এর আদলে আন্তর্জাতিক সংস্করণে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির এসফিল্ড হেরিটেজ পার্কে প্রতিষ্ঠালাভ করে বিশ্বের প্রথম ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ’।
এই স্মৃতিসৌধের পাদদেশে একুশের প্রথম প্রহরে খালি পায়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষ। একুশে বইমেলা, একুশের চেতনা ভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বাঙালিদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও এই ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধের মর্মবার্তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। একই চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিভিন্ন ভাবে গড়ে উঠছে একুশের চেতনার সম্প্রসারিত কার্যক্রম। এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পর এর ডিজাইন নিয়ে কমিউনিটিতে কোনো বিতর্ক উঠেনি।
সিডনির দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ:
২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বেলমোরের পীল পার্কে উদ্বোধন করা হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ। বাংলাদেশী কমিউনিটি ও ক্যান্টারবারী- ব্যাংক্সটাউন সিটি কাউন্সিলের উদ্যোগে এই স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়। মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মূল পরিকল্পনা গ্রহণ করেন হাসান ফারুক শিমুন রবিন ও কাউন্সিলর নাজমুল হুদা। স্মৃতিস্তম্ভ তৈরীর জন্য ফান্ডরেইজিং গালা ডিনার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কমিউনিটি থেকে প্রায় ৪৩ হাজার ডলার সংগ্রহ করা হয় এবং অতিরিক্ত খরচ কাউন্সিলের পক্ষ থেকে অর্থায়ন করা হয়। বাস্তবায়ন কমিটির দায়িত্ব ছিলেন কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাজমুল হুদা, মুনীর হোসেন, সাবেক কাউন্সিলর ও সাবেক ফেডারেল এমপি প্রার্থী শাহে জামান টিটু, লিঙ্কন শফিকউল্লাহ, নোমান শামীম সহ বাংলাদেশী কমিউনিটির অন্যান্য নেতৃবন্দ।
সিডনির দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ উদ্বোধনের পর বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এর ডিজাইন নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকেই বলছেন, ফান্ডরেইজিং অনুষ্ঠানের সময় একটি ডিজাইনটি দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে কিন্তু নির্মাণ করা হয়েছে অন্য ডিজাইনে। যাহা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কোন আদল বহন করেনা। এই স্তম্ভ নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করবে।
সিডনির এসফিল্ড হেরিটেজ পার্কে নির্মিত বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মৃতিসৌধটিতে ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদল, আন্তর্জাতিক সংস্করণ এবং মাতৃভাষার প্রতীক বহন করে। তাছাড়া বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের সময় যখন অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়, সেগুলোও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলেই তৈরী করা হয়ে থাকে।
Australia Times 24
ব্যুরো চীফ
আবদুল মতিন ভাইর ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত